আলোর প্রতিসরণ (Refraction of Light) সংজ্ঞা: আলোক রশ্মি এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে তীর্যকভাবে প্রবেশ করলে দুই মাধ্যমের বিভেদতলে এর দিক পরিবর্তন হয়। এই দিক পরিবর্তনের ঘটনাকে আলোর প্রতিসরণ বলে। প্রতিসরণের সূত্র (Laws of Refraction): প্রথম সূত্র: আপতন রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে। দ্বিতীয় সূত্র (স্নেলের সূত্র): নির্দিষ্ট একজোড়া মাধ্যম ও নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর জন্য আপতন কোণের সাইন ($i$) এবং প্রতিসরণ কোণের সাইনের ($r$) অনুপাত সর্বদা ধ্রুব থাকে। $\frac{\sin i}{\sin r} = \text{ধ্রুবক} = n$ (প্রতিসরণাঙ্ক) আলোর বেগের উপর নির্ভরতা: ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে আলোর বেগ ভিন্ন হওয়ার কারণে প্রতিসরণ ঘটে। ঘন মাধ্যমে আলোর বেগ কম, হালকা মাধ্যমে বেশি। প্রতিসরণাঙ্ক (Refractive Index) সংজ্ঞা: দুটি মাধ্যমের আপতন কোণ ও প্রতিসরণ কোণের sin এর অনুপাতকে ঐ মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক বলে। পরম প্রতিসরণাঙ্ক ($n$): শূন্য মাধ্যমের সাপেক্ষে অন্য কোনো মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক। $n = \frac{c}{v}$ (যেখানে $c$ শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ, $v$ অন্য মাধ্যমে আলোর বেগ) কিছু মাধ্যমের পরম প্রতিসরণাঙ্ক: মাধ্যম পরম প্রতিসরণাঙ্ক শূন্য মাধ্যম 1.00 বাতাস 1.00023 পানি 1.33 কাচ 1.52 হীরা 2.42 আপেক্ষিক প্রতিসরণাঙ্ক ($_{1}n_{2}$): কোনো আলোক রশ্মি যখন এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে তীর্যকভাবে প্রবেশ করলে এক মাধ্যমের সাপেক্ষে অন্য মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক। যদি প্রথম মাধ্যম 1 ও দ্বিতীয় মাধ্যম 2 হয়, তাহলে $n_1 \sin \theta_1 = n_2 \sin \theta_2 \implies \frac{n_2}{n_1} = \frac{\sin \theta_1}{\sin \theta_2} = _{1}n_{2}$ সম্পর্ক: $_{1}n_{2} = \frac{n_2}{n_1} = \frac{v_1}{v_2}$ পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন (Total Internal Reflection) ক্রান্তি কোণ ($\theta_c$): ঘন মাধ্যম থেকে আলোক রশ্মি যখন হালকা মাধ্যমে প্রতিসরিত হয়, তখন আপতন কোণের যে মানের জন্য প্রতিসরণ কোণের মান $90^\circ$ হয় সে কোণকে দুই মাধ্যমের ক্রান্তি কোণ বলে। $\sin \theta_c = \frac{n_2}{n_1}$ (যেখানে $n_1$ ঘন মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক, $n_2$ হালকা মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্ক) শর্তাবলী: আলোক রশ্মিকে ঘন মাধ্যম থেকে হালকা মাধ্যমে প্রবেশ করতে হবে। আপতন কোণের মান ক্রান্তি কোণের চেয়ে বেশি হতে হবে ($i > \theta_c$)। উদাহরণ: মরীচিকা, অপটিক্যাল ফাইবার, হীরার উজ্জ্বলতা। অপটিক্যাল ফাইবার: কাচ বা প্লাস্টিকের সরু তন্তু, কোর ও ক্লাড দিয়ে গঠিত। কোর থেকে ক্লাডে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে আলো সঞ্চালিত হয়। লেন্স (Lens) সংজ্ঞা: দুটি গোলীয় পৃষ্ঠ দ্বারা সীমাবদ্ধ কোনো স্বচ্ছ প্রতিসারক মাধ্যম। উত্তল লেন্স (Converging Lens): মধ্যভাগ পুরু ও প্রান্তভাগ সরু। সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছকে একটি বিন্দুতে অভিসারী করে। অবতল লেন্স (Diverging Lens): মধ্যভাগ সরু ও প্রান্তভাগ পুরু। সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছকে অপসারী করে। আলোক কেন্দ্র (Optical Centre): লেন্সের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত রশ্মি দিক পরিবর্তন করে না। প্রধান ফোকাস (Principal Focus - $F$): প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ প্রতিসরণের পর যে বিন্দুতে মিলিত হয় (উত্তল) বা যে বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয় (অবতল)। ফোকাস দূরত্ব ($f$): আলোক কেন্দ্র থেকে প্রধান ফোকাস পর্যন্ত দূরত্ব। লেন্সের ক্ষমতা ($P$): ফোকাস দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক। $P = \frac{1}{f}$ (একক: ডায়াপ্টার, D)। উত্তল লেন্সের ক্ষমতা ধনাত্মক (+), অবতল লেন্সের ক্ষমতা ঋণাত্মক (-)। লেন্সের সূত্র ও বিবর্ধন (Lens Formula and Magnification) লেন্সের সূত্র: $\frac{1}{u} + \frac{1}{v} = \frac{1}{f}$ (যেখানে $u$ বস্তুর দূরত্ব, $v$ প্রতিবিম্বের দূরত্ব, $f$ ফোকাস দূরত্ব) উত্তল লেন্সের জন্য $f$ ধনাত্মক (+), অবতল লেন্সের জন্য $f$ ঋণাত্মক (-)। বাস্তব প্রতিবিম্বের জন্য $v$ ধনাত্মক (+), অবাস্তব প্রতিবিম্বের জন্য $v$ ঋণাত্মক (-)। রৈখিক বিবর্ধন ($m$): $m = \frac{\text{প্রতিবিম্বের উচ্চতা}}{\text{বস্তুর উচ্চতা}} = -\frac{v}{u}$ বাস্তব ও উল্টা প্রতিবিম্বের জন্য $m$ ঋণাত্মক (-)। অবাস্তব ও সোজা প্রতিবিম্বের জন্য $m$ ধনাত্মক (+)। চোখের ত্রুটি (Defects of Vision) হ্রস্বদৃষ্টি (Myopia/Short-sightedness): কারণ: অক্ষিগোলকের ব্যাসার্ধ বৃদ্ধি বা লেন্সের ফোকাস দূরত্ব কমে যাওয়া (অভিসারী ক্ষমতা বৃদ্ধি)। ফলাফল: দূরের বস্তু অস্পষ্ট দেখায়, প্রতিবিম্ব রেটিনার সামনে গঠিত হয়। প্রতিকার: অবতল লেন্স ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদৃষ্টি (Hypermetropia/Long-sightedness): কারণ: অক্ষিগোলকের ব্যাসার্ধ হ্রাস বা লেন্সের ফোকাস দূরত্ব বেড়ে যাওয়া (অভিসারী ক্ষমতা হ্রাস)। ফলাফল: কাছের বস্তু অস্পষ্ট দেখায়, প্রতিবিম্ব রেটিনার পেছনে গঠিত হয়। প্রতিকার: উত্তল লেন্স ব্যবহার করা হয়। উপযোজন (Accommodation): চোখের লেন্সের ফোকাস দূরত্ব প্রয়োজন মতো পরিবর্তন করে বিভিন্ন দূরত্বের বস্তু দেখার ক্ষমতা। স্পষ্ট দর্শনের ন্যূনতম দূরত্ব: ২৫ সেমি (স্বাভাবিক চোখের জন্য)। ব্লাইন্ড স্পট: রেটিনার যে অংশে অপটিক স্নায়ু সংযুক্ত হয়, সেখানে কোনো প্রতিবিম্ব গঠিত হয় না। রঙিন বস্তুর আলোকীয় উপলব্ধি (Optical Perception of Colored Objects) রড কোষ: কম আলোতে দেখতে সাহায্য করে, রঙের পার্থক্য করতে পারে না। কোন কোষ: বেশি আলোতে কাজ করে, রঙের পার্থক্য করতে পারে। তিন ধরনের কোন কোষ আছে: নীল, সবুজ ও লাল রঙের প্রতি সংবেদনশীল। বস্তু যে রঙের হয়, সেই আলো শোষণ করে বাকি রঙগুলো প্রতিফলিত করে। উদাহরণ: লাল আলোতে সবুজ পাতা কালো দেখায় কারণ সবুজ পাতা লাল আলো শোষণ করে নেয়।